সড়কে আর কত কান্না?

ভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে সৃষ্ট সবচেয়ে প্রধান সমস্যা-অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’। একটি সড়ক দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙ্গে যাচ্ছে সাজানো স্বপ্ন, তছনছ হয়ে যাচ্ছে সুখের সংসার। এখন কর্মজীবী মানুষ যথাসময়ে বাসায় না ফিরলে প্রথম যে ‘আশঙ্কা’ মনে দানা বাধে সেটি হলো সড়ক দুর্ঘটনা। গত ছয় মাসে দেশের সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আড়াই হাজার মানুষের প্রাণ গেছে। প্রতিদিনই সড়ক-মহাসড়কগুলো মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের আন্তরিকতা ও জনসচেতনতা অভাবেই কমছে না সড়ক দুর্ঘটনায় আহত-নিহত মানুষের সংখ্যা।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী চলতি মাসের ১ থেকে ৫ জুলাই (৫ দিন) সন্ধ্যা পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ ২১ জন নিহত হয়েছে।

বেসরকারি সংগঠন শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ছয় মাসে সারাদেশে ২ হাজার ১৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৩২৯ জন নিহত ও ৪ হাজার ৩৬১ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২৯১ জন নারী এবং ৩৮১ জন শিশু। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক, আন্তঃজেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কসহ সারাদেশে এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে।

এসসিআরএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারিতে ৩৮৩টি দুর্ঘটনায় ৫৩ নারী ও ৭১ শিশুসহ ৪১১ জন নিহত এবং ৭২৫ জন আহত হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ৪০১টি দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হয়েছে যথাক্রমে ৪১৫ ও ৮৮৪ জন। নিহতের তালিকায় ৫৮ জন নারী ও ৬২ জন শিশু রয়েছে। মার্চে ৩৮৪টি দুর্ঘটনায় ৪৬ নারী ও ৮২ শিশুসহ ৩৮৬ জন নিহত ও ৮২০ জন আহত হয়েছে। এপ্রিলে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩২৭টি। এতে ৩৪০ জন নিহত ও ৬১০ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৩৮ নারী ও ৫৩ শিশু রয়েছে। মে মাসে ২৯৭টি দুর্ঘটনায় ৪৭ নারী ও ৪৪ শিশুসহ ৩৩৮ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৫০৪ জন। জুনে দুর্ঘটনার সংখ্যা ৩৬৭টি। এতে ৪৩৯ জন নিহত ও ৮১৮ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা যথাক্রমে ৪৯ ও ৬৯।

সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, গাড়ি আমরা চালাই না। চালায় চালক। চালক ও পথচারী যেন আইন মেনে চলে তার জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়ে থাকি মাত্র। তা ছাড়া একেক দুর্ঘটনার জন্য একেকজন দায়ী। কোথাও চালক দায়ী, কোথাও হেলপার দায়ী। কোথাও গাড়ির ফিটনেস না থাকা দায়ী। মোটকথা প্রত্যেকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব বলে মনে করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

সাম্প্রতিক সড়কে দুর্ঘটনাগুলো বিশ্লষণে দেখা যায়, বেশিরভাগ সময় দুর্ঘটনা সংঘঠিত হওয়ার পরে হাসাপাতালের পৌঁছানোর পূর্বেই অধিকাংশ রোগী মারা যাচ্ছে।

এর কারণ সম্পর্কে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) নির্বাহী পরিচালক ডা. একেএম ফজলুর রহমান বলেন, ‘দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রাথমিক জরুরি সেবার অনুপস্থিতি বেশি সংখ্যক মৃত্যুর প্রধান কারণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইমারজেন্সি মেডিকেল সার্ভিস বলতে আমরা যা বলি, উন্নত বিশ্ব যেটা ঘটে, যদি একটা দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে প্রথমেই একটা কল সেন্টারে ইনফর্ম করা হয়। এরপর প্রশিক্ষিত ম্যানপাওয়ার পাঠানো হয়। সেই টিম উদ্ধার করার পরে যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে সেইখানেই একটা ব্যবস্থা হবে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে যেটুকু চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব সেটা দিয়ে হাসপাতালে সঠিকভাবে ট্রান্সফার করা হয়। হাসপাতালে জরুরি বিভাগে লোক রেডি থাকে। তারা সেখানেই ইমারজেন্সি রুমে চিকিৎসা দেওয়ার পরই যদি দরকার হয় তাহলে ইনডোরে ভর্তি করা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে সমন্বিতভাবে এই তিনটা বিষয় গড়ে ওঠেনি।’

দুর্ঘটনার পর পুলিশের সহায়তা পেলেও চিকিৎসা মেলে না 

দেশে কিছুদিন ধরে জরুরি সেবা সার্ভিস বা জরুরি কল সেন্টার ৯৯৯ চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের সেবা চালু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের কার্যক্রম সেভাবে শুরু হয়নি। যদিও ৯৯৯ কল করে পুলিশের সেবা পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে।

যেকোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে জরুরি সেবা সার্ভিসে ৯৯৯ এ কল করে পুলিশি সেবা পাওয়া গেলেও চিকিৎসা সেবার কোনো ব্যবস্থা নেই। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করে অথবা আইনি সাহায্য দিলেও পুলিশ চিকিৎসা দিতে পারে না। এতে নষ্ট হয় খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। অনেক সময় দুর্ঘটনার ক্ষেত্র কয়েক মিনিটের ওপরও আহত ব্যক্তির বেঁচে থাকা নির্ভর করে। দেখা যায় প্রয়োজনে পাওয়া যায় না অ্যাম্বুলেন্স। আবার সেটি পাওয়া গেলেও তার সঙ্গে থাকছে শুধু গাড়ির চালক ও সহকারী। অ্যাম্বুলেন্সে জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার যোগ্য কেউ যেমন থাকে না, তেমনি কোনো যন্ত্রপাতিও থাকে না। বরং বাংলাদেশে সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রথম সাহায্যকারী আশপাশের মানুষজন। যারা মারাত্মক আহতদের সঠিকভাবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রশিক্ষিত নন।

২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বাংলাদেশে কার্যকর সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত সংঘটিত একটি আন্দোলন বা গণবিক্ষোভ। ঢাকায় ২৯ জুলাই সংঘটিত এক সড়ক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে নিহত দুই কলেজ শিক্ষার্থীর সহপাঠিদের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ পরবর্তীতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ৯ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে।

তখন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ খান বলেছিলেন, ‘শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের ছাত্রদের গায়ে বাস তুলে দেওয়ার জন্য পুরোপুরি চালক দায়ী নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীণতার সংস্কৃতি গড়ে উঠায়, কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনায় চলছে। কোনোভাবেই যেন কমছে না সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু। প্রায় প্রতিদিনই ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করছেন বহু মানুষ। সঠিক মনিটরিংয়ের অভাব ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে মূলত এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে প্রতিনিয়ত বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালক বা মালিকের উপযুক্ত শাস্তির নজির নেই। পুলিশ ও সরকারি আইন কর্মকর্তাদের উদাসীনতার পাশাপাশি চালক ও মালিকদের সাজা শিথিল এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির অভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। মূল কারণ সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের প্রয়োগ না হওয়া। সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে দায়ী ব্যক্তির শাস্তির বিধান থাকলেও কার্যত এখনো কোনো বিচার কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘এ যাবৎকালে যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে তার ৮০% নানাভাবে প্রশাসন-মালিক-চালক বা দোষী ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। ২০% ঘটনায় মামলা হয়। তবে যেসব ঘটনায় মামলা হয় তার মধ্যে ৯৯% কোনো না কোনো তদবিরে ছাড় পেয়ে যায়। বাকি ১% এর শাস্তি শেষ পর্যন্ত নানা অদৃশ্য কারণে বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাস্তবায়ন হয় না।’

গত বছর শহীদ রমিজ উদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সারা দেশে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে সরকার ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বিল সংসদে পাস করে। সরকার ১৯ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে পাস করে।

সড়ক পরিবহন আইনে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রাণহানির দায়ে অভিযুক্তদের অপরাধ জামিনযোগ্য নয় বলে আইনে বলা হয়েছে। এ ছাড়া উদ্দেশ্যমূলক বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো দুর্ঘটনা প্রমাণিত হলে পেনাল কোডের ৩০২ ধারা মোতাবেক অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড সাজা হবে।

তবে ওই আইনে বলা হয়েছে, সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যে তারিখ নির্ধারণ করবে, সেই তারিখে এই আইন কার্যকর হইবে। কিন্তু আইন পাসের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সরকার গেজেট প্রকাশ করে আইনটি এখনো কার্যকর করেনি। ফলে আইন এখনো অকার্যকর রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *