যৌতুক প্রথা: চট্টগ্রামের এই কুপ্রচলন কি বন্ধ হবে না.?এটা ডাকাতি..==== মুক্তি

আজ আমাদের সমাজ ব্যবস্থার জন্য অভিশাপের অপর নাম হল যৌতুকপ্রথা। আমাদের সুন্দর পারিবারিক জীবনকে বিস্বাদময় করার পিছনে অধিকাংশ ভূমিকা হলো এই যৌতুক প্রথার।

এই যৌতুকপ্রথা বিলুপ্ত হবে না কি কখনো ?

কেন মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া পাপ নাকি মেয়ের বাবা হওয়া অপরাধ ?

আচ্ছা সব ছেলের বাবাদের কি মেয়ে থাকে না ?

আর ছেলের কি বোন থাকে না ?

এসব ডাকাতী কি বন্ধ হবে না ?

হ্যাঁ এটা ডাকাতি। কারণ তাদের চাহিদা মত না এলেও মেয়ের ছাড় নাই। আমাদের চট্টগ্রামের এই কুপ্রচলন কি বন্ধ হবে না ? কেন হচ্ছে না ?

চট্টগ্রামের অধিকাংশ ছেলের পরিবারের মতো জাত ভিখারি এবং ডাকাতি করা স্বভাব হয়ে দাড়িয়েছে। আবার জিনিসের মান নিয়েও কথা শুনাই এরা। এদের ছেলেরা এমনই রাজপুত্র যে বিয়ের সময় মেয়েপক্ষকে তাদের গুষ্টির হাজারখানেক লোক খাওয়াইতে হবে।

বিয়ের সময় ফার্নিচার থেকে শুরু করে,বালিশ,বিছানা,থালা, ঘটি, বাটি, এমনকি বদনাটাও মেয়ের বাড়ি থেকে ডাকাতের মতো জুলুম করে হাত পেতে নেবে। স্বভাব ভিক্ষুকগুলোর আম কাঁঠালের সিজনে নিজের পয়সায় ফল কিনে খাওয়ার মুরোদ নাই, সেইটাও মেয়ের বাড়ি থেকে আসতে হবে।যেন তারা নবাব সিরাজউদ্দৌলার বংশধর। যেন তাদের ছেলে বিয়ে করে মেয়ের বাবার চৌদ্দগুষ্টি জীবন ধন্য করে ফেলবে। এর একটা চাহিদা পূরণ করতে না পারলে মেয়ের জাত বংশ তুলে খোঁটা দেওয়া তো আছেই।

আমি নিশ্চিত, চট্টগ্রামের বিয়েগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করলে ঝাঁকে ঝাঁকে যৌতুকের কেইস পাওয়া যাবে। সবচেয়ে দু:খজনক বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষিত ছেলেগুলোও অনেকে দেখি খাবার নিয়ে, পোশাক নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে মা বাপের সাথে তর্ক করতে পারবে, কিন্তু বিয়ের সময় “যৌতুক নিবো না, মেয়ের বাড়ি থেকে জিনিসপত্র নিবো না” এইটা আর জোর গলায় বলতে পারবে না। ঠিকই তখন মা বাপের ভেড়া সেজে মিনমিন করতে থাকবে।

বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের সময় “চিটাগাং এর মানুষ অতিথিপরায়ণ”, “আমাদের আত্মীয় স্বজন ছাড়া হয় না, আমাদের আত্মীয় বেশি, আমরা সবাইকে আপন ভাবি” এইগুলা বলার আগে নিশ্চিত হয়ে নেন আপনাদের আত্মীয়তা আর অতিথিপরায়ণতার খরচ মেয়ের বাবার কান মুচড়ে আদায় করে নেওয়া হচ্ছে কিনা ?

সবাই বলে যৌতুক বিরোধী কথা বলেন। যেখানে ঢালাও ভাবে বলেই যায়।যখন নিজের মেয়ে বা বোনকে দিতে হয় তখন বলেন। নিজে বিয়ে করার সময় বা ছেলেকে বিয়ে করানোর সময় বা ছেলেকে বিয়ে করানোর সময় তখন কি আপনাদেরর এসব কথা মনে থাকে না ?

একজন মেয়ে কিংবা তার পরিবার জানেন ছেলে পক্ষের এই চাহিদা মেঠাতে তারা কতটা হিমশিম খেয়ে যায়। একজন বাবা কত কষ্ট করে একটা মেয়ে বিয়ে দেয় শুধু মেয়ের বাবাই জানেন। কোন ধর্মে লেখা আছে, বিয়েতে মেয়েকে মাথা থেকে পা অব্ধি স্বর্ণ অলংকার দিতে হবে ?

মেয়ের সাথে আসবাবপত্র সাথে ছেলের জন্য গাড়ী আবার টাকাও দিতে হবে ?

ছেলের পরিবারকে কাপড় দিতে হবে ?

এসব সমাজ তৈরী করেছে। কোন ধর্মে আছে ইদে আর পূজায় ছেলের পরিবারকে কাপড় দেওয়া লাগে ?

কোরবানের আর পূজার পশুর টাকা মেয়ের বাড়ী থেকে দেওয়া লাগে ?

সব অনুষ্টানে সব সময় তাদের চাহিদা না মিঠালে মেয়েকে কথা শুনাবে,শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করবে।হয়তো প্রাণেও মেরে ফেলবে।

এইতো ১০ই মার্চ ফটিকছড়ির সুয়াবিলে ৭মাসের অন্তঃসত্তা মহিলার স্বাদ অনুষ্টানে ছেলে পক্ষের দাবী মেটাতে না পারায় খুন করা হয় মহিলাটাকে। এরকমভাবে আমাদের দেশে নির্যাতিত হতে হচ্ছে প্রাণ দিতে হচ্ছে মেয়েদের।

এইবার আসি সমাজের কথায়… সমাজ তো আজকাল মেয়ে শ্বশুরগৃহে আসার সময় কি কি এনেছে,আর সেই জিনিসগুলোর মান যাচাই করে মেয়েকে কথা শুনানো আর ছেলে পক্ষকে উস্কানি দেওয়া। অথচ নিজের মেয়ের সাথে এমন হলে কি হতো ভাবেই না এরা। এই সমাজ এসব রেওয়াজ তৈরী করেছে,বিয়েতে শত শত লোক খাওয়ানো,লাখ লাখ টাকা খরচ করা। তাও তাদের চাহিদা মেঠে না। বিয়ের পরও তাদের নানারকম চাহিদা পূরণ না হলে তাদের তো অপমান করেনই। আবার মেয়েকেও অত্যাচারিত হতে হয়।

এই সমাজ বলে,আপনি যদি যৌতুক না দেন কারও বাপের ক্ষমতা আছে আপনার মেয়ে নিয়ে যাবে ?

এই সমাজের মানুষগুলোই দুমুখো সাপ। এরাই আবার মেয়ের বয়স কুড়ি হতে তারে বুড়ি উপাধি দেয়। তার আগেই অনেকে মেয়ে বিয়ে দেয়। মেয়ে বড় হলে সমাজের চোখে কাটা। মেয়ের বয়স হচ্ছে,সম্মান থাকতে থাকতে আপদ দূর করো যত টাকা লাগে ঢালো। এরা ভাবে না নিজেদের ক্ষেত্রে হলে কেমন লাগতো। আর ছেলের পক্ষ কে বলি,আরে ভাই লজ্জা করে না।বিয়ে করে তাদের মেয়েরে সংসারের দাসী বানাই রাখো বিনে পয়সায় ঝি রাখো তো বটেই। আবার মেয়ের বাবার কাছে হাত পেতে নিতে লজ্জা করে না ?

যখন নিজের সময় আসবে সেদিন বুঝবে। যৌতুকের জন্য বউ মারা, অত্যাচার করো, মেরে ফেলো।

ভাবো ? তাদের মেয়ে এতদিন খাইয়ে পড়িয়ে,বড় করে,পড়ালেখা করিয়ে চাকরী করাই তো টাকা তুমি নাও। তাও মেয়েকে বাপের বাড়ী থেকে দেওয়া জিনিস তোমাদের চাহিদা মেটে না। আর টাকা না আনলে চাওয়া মাত্র।মনে হয় না এসব ভিক্ষা নিচ্ছ ? এটা হয় ভিক্ষা নয়তো ডাকাতি। মেয়ের বাবার অপরাধ কি?তার একটা মেয়ে আছে? জানেন যে মেয়ে মায়ের জাত এই যৌতুকের মতো অভিশাপ এর জন্য পরিবারে কন্যা সন্তান বোজা আর অভিশাপ ভাবে সে মা নিজেও। এই যৌতুকের জন্য জীবন যায় নিরহ মেয়েদের। আজ আরেকজনের মেয়ের সাথেও এমন ঘটা ঘটনা আপনার মেয়ের সাথে বা বোনের সাথে যে ঘটবে না সে কথা কে বলতে পারে ?

এই যৌতুকের বিরুদ্ধে যদি সমাজের মানুষগুলো এগিয়ে আসতো।হয়তো কত মেয়ের জীবন বেঁচে যেত।কত বাবা আত্মহত্যা করা বন্ধ হতো। এই যৌতুকপ্রথা আমাদের দেশ এবং সমাজ এর জন্য অভিশাপ আসুন আমরা এর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াই। আসুন নিজে বদলায় সমাজকে বদলে দি চলুন আমরা যৌতুককে না বলি, যৌতুক বিরোধী সমাজ গড়ি।

তরুণ লেখিকা: মুক্তা চক্রবতী মুক্তি

সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ

হাটহাজারী সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ,চট্টগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *