ভেজালে সয়লাব হাটহাজারী: অলিগলিতে দেশি-বিদেশি পণ্যের নকল কারখানা

উপর্যুপরি অভিযানের পরেও কোনভাবেই রোধ করা যাচ্ছেনা হাটহাজারীর ভেজাল খাদ্যপণ্যের বেচাকেনা। হাটহাজারীর অলিগলিতে এমনকী কুড়েঘরেও গড়ে উঠেছে এক একটি ভেজাল পণ্যের কারখানা। দেশি কিংবা বিদেশি ব্রান্ডের যে কোন পণ্যের হুবহু মোড়ক নকল করে বাজারজাত করা হচ্ছে ভেজাল খাদ্যপণ্য। এরই মধ্যে হাটহাজারী প্রশাসন বিশেষ অভিযানে সন্ধান পেয়েয়ে অন্তত ডজনখানেক ভেজাল পণ্যের কারখানা।

সাম্প্রতিক সময়ে ভোগ্যপণ্যের বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে হালদায় দূষণ, ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল বন্ধ, ঘেরাজাল আটক, অবৈধভাবে বালূ উত্তোলন, বন্য প্রাণি উদ্ধার থেকে শুরু করে নানা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান, বাল্য বিবাহ বন্ধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়মসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনা করেন।
তবুও হাটহাজারী উপজেলায় অনেক বড় বড় ভেজাল পণ্যের কারখানা, টপসয়েল কাটাসহ বেশ কিছু স্থানে অভিযান পরিচালিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

জানা গেছে, রোজা শুরুর আগে থেকেই হাটহাজারী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন উপজেলার বিভিন্ন বাজারে অভিযান পরিচালনা শুরু করেন। অভিযানে একের পর এক বেরিয়ে আসে ভেজাল পণ্যের কারখানা। রোজার আগে থেকেই বাঘাবাড়ি ঘিয়ের কারখানার সন্ধান রীতিমতো আতংকিত করে তোলে ভোক্তাদের। এসব ঘি একশ্রেণির অসাধু বাবুর্চির যোগসাজশে হাটহাজারীসহ পুরো চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর একে একে বেরিয়ে আসে দুধ, চাপাতা, সয়াবিন তেল, মসলাসহ প্রায় সকল ভোগ্যপণ্যের ভেজাল তৈরির কারখানা।

এদিকে, একের পর এক ভেজাল কারখানার সন্ধান পাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে হাটহাজারীর ভোক্তারা। এতদিন এসব ভেজাল পণ্য গ্রহণ করার ফলে তাদের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হবে কিনা এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
আমির হোসেন নামে একজন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, হাটজাহারী যেভাবে ভেজালে ভরে গেছে যে কোন খাদ্য পণ্য কিনতে ভয় লাগে। এতদিন জানতাম ফলে ফরমালিন রয়েছে। এখন দেখছি ভোগ্যপণ্যের সব কিছুতেই ভেজাল। এই অবস্থায় আমাদের যাওয়ার জায়গা কোথায়। তবে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভেজাল বিরোধী এই উদ্যোগকে অধিকাংশ লোক স্বাগত জানালেও বড় বড় কারখানায় অভিযান পরিচালনা না করায় তারা উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাটহাজারীর এক রাজনৈতিক নেতা জানান, অভিযান পরিচালিত হচ্ছে ছোটখাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। হাটহাজারীতে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান ভেজাল কারবারের সাথে জড়িত। সেখানে প্রশাসনের অভিযান এখনো চোখে পড়েনি। এছাড়া চিকনদন্ডীর লাল চন্দ্রবিল ও কাটাখালিতে টপ সয়েল কেটে রাতে আধারে মাটি কাটা চললেও সেখানে প্রশাসন অভিযান চোখে পড়েনি। বিষয়টি রহস্যজনক।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে বিভিন্ন অভিযান একসাথে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

হাটহাজারীতে পরিচালিত অভিযানসমূহ

সর্বেশেষ শুক্রবার (১৭ মে) দুপুরে হাটহাজারী উপজেলার তিন নম্বর মির্জাপুর ইউনিয়নের সরকারহাট বাজার এলাকার জগন্নাথ বাড়ির রোডে একটি কক্ষে অভিযান চালানো হলে ভেজাল পণ্যের কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। তালা ভেঙে ছোট কারখানাটির ভিতরে প্রবেশ করে দেখা যায় দেশি বিদেশি প্রায় ২০ পণ্য উৎপাদন এবং প্যাকেটজাত করা হচ্ছিল। সিলন চা, মির্জাপুর চা, রাধুনি, সরিষা তেল, রাধুনি হালিম মিক্সড, রাধুনি পায়েস মিক্স ও বিদেশি নানান ব্রান্ডের নকল পণ্য বানানো হচ্ছিল এই কারখানায়।

গত ১৬ মে হাটহাজারী উপজেলার ইছাপুর বাজারে অভিযান পরিচালনা সময় মধুবন মিষ্টির দোকানের শ্রমিকরা তাদের দোকানে রাখা পঁচা মিষ্টি পাশ্ববর্তী ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। অভিযানের সময় মেয়াদোত্তীর্ণ স্টিকার রাখার দায়ে মধুবন মিষ্টির দোকানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মঙ্গলবার (১৪ মে) বিকাল ৩ টায় হাটহাজারী উপজেলার ধলই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বালুর টাল এলাকার একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে এক টন ভেজাল ও নিম্নমানের চা, মসলা জব্দ করা হয়। ৮ ফুট প্রস্থ ১৫ ফুট দৈর্ঘ্যের একটা ছোট্ট ঘরে দেশি-বিদেশি প্রায় ২৮ পণ্য প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। সিলন চা, মির্জাপুর চা, রাধুনি সরিষা তেল, রাধুনি হালিম মিক্সড, রাধুনি পায়েস মিক্সডসহ দেশি-বিদেশি নানান ব্রান্ডের নকল পণ্য তৈরি এবং বিভিন্ন কেমিক্যালে বানানো হচ্ছিলো ট্যাং আদলে ড্রিংকসহ পাঁচ রকমের ঘি।

১২ মে (রবিবার) হাটহাজারী বাজারে ফুলকলির একটি বিক্রয় কেন্দ্রে রসমালাই ও গাজরের হালুয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণের স্টিকার লাগানোর সময় হাতেনাতে ধরা পড়ায় পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই দিন বিকাল পাঁচটায় কলেজ গেট এলাকার হোটেল দস্তগীরে পেয়াজু মচমচে রাখার জন্য ক্ষতিকর এমোনিয়া ব্যবহার, তিনদিনের বাসি জিলাপি তৈরির খামি এবং খাদ্যে কাপড়ের রং ব্যবহার করার অপরাধে পাঁচ হাজার টাকার জরিমানা করা হয়। ১১ মে হাটহাজারী বাজারস্থ চৌধুরী হোটেলে এমোনিয়া, সোডা, লাল রং এবং পোড়া তেল ব্যবহারের দায়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ১০ মে কাটিরহাট বাজারে প্রকাশ্যে রাসায়নিক মিশিয়ে জিলাপি, পেয়াজু, বেগুনি, বড়াসহ ইফতার সামগ্রী বিক্রির দায়ে একটি দোকানে ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এই দিন নিষিদ্ধ পলিথিন ও ভেজাল ঘি বিক্রির দায়ে অন্য একটি দোকানে ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং ১ হালি কলা ৫০ টাকা দামে বিক্রির দায়ে বিক্রেতাকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

৯ মে দুপুর ১২ টায় ক্রেতা সেজে হাটহাজারী কাচা বাজারের মাংসের দোকানে হাজির হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন। সেখান তিনি দেখতে পান মাংসের দাম ৭শ টাকা। তিনি ৭ শ টাকা দিয়ে মাংস কিনে পরক্ষণে নিজের পরিচয় দিলে মাংস বিক্রেতার চোখ কপালে উঠে। বেশি দামে মাংস বিক্রির দায়ে তিন মাংস বিক্রেতাকে ৩৫ হাজার জরিমানা আদায় করা হয়। একই দিনে বুডির চরে একটি ঘি কারখানায় অভিযান চালিয়ে দেড় হাজার লিটার ভেজার ঘি জব্দ করে। আবদুল আউয়াল নামের ওই কারখানার মালিককে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় বাঘাবাড়ি ঘিসহ বিভিন্ন ব্রান্ডের ২ লাখ স্টিকার জব্দ করা হয়।
৭ মে হাটহাজারী কাচা বাজারে বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালিয়ে ১ হাজার লিটার বাঘাবাড়ির ভেজাল ঘি জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভেজাল ঘি বিক্রির দায়ে এসকে স্টোরকে ৫ হাজার টাকা, গাউছিয়া স্টোরকে ১ হাজার টাকা, নন্না মিয়া স্টোরকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া জব্দ করা ঘি ধ্বংস করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *