বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশংকা মিরসরাইয়ে দখল আর দূষনের কবলে খালগুলো

দখল আর দূষনের কারণে ভরাট হয়ে গেছে মিরসরাই উপজেলার অধিকাংশ খাল-ছরা। আসন্ন বর্ষায় পানি নিস্কাসন না হয়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশংকা করছেন এখানকান বাসিন্দারা।

এক সময়ের জোয়ার-ভাটা খেলা করা প্রবাহিত অধিকাংশ খাল আজ প্রাণহীন এক একটি বর্জ্য স্তপের নর্দমা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের রুপ বৈচিত্রময় খালগুলো এখন মিরসরাইবাসীর দুঃখের কারন হিসেবে পরিণত হচ্ছে।

খালের দু’ধারে দখল করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাসা-বাড়ি, দোকান পাট গড়ে ওঠা এবং বাজার ও বসতবাড়ির বর্জ্য ফেলার কারণে এক সময়ের প্রবাহমান খালগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। কয়েকটি খালের পানি প্রবাহিত না হওয়ায় এবং বর্জ্যের স্তুপের কারণে খালের পঁচা পানি দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

ফলে এই খালগুলো পরিবেশ দূষণের জন্য অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করেরহাট বাজারে সামান্য বৃষ্টি হলেই বাজারে হাটুপানি হয়ে যাচ্ছে। কারন একমাত্র পানি অপসারনের ছরাটি দখল আর দূষনে মজে গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় অধিকাংশ খাল আজ মৃত প্রায়। বছরের পর বছর ধরে এই খালগুলো খনন না করায় খালে বর্জ্য আবর্জনায় কিছুটা ভরাট হয়ে এলে স্ব স্ব স্থানীয়রা খালপাড়ের জমিতে বসত বাড়ী র্নিমাণের ফলে খালগুলো সসংকুচিত হয়ে আসছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে খালের গভীরতা ।

দুই পাড়ের অবস্থা সংকুচিত। খাল পাড়ে বন-জঙ্গলে একাকার হয়ে আছে। আসন্ন বর্ষায় এবারও পানির চাপে খালগুলোর পানি উপচে পড়ে স্থানীয় অনেক জনপদ তলিয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন পরিবেশ বিশ্লেষকরা।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অনেক ছরার পাড়ে বসত বাড়ী করার জন্য অন্যত্র জমি থেকে মাটি এনে ছরার মধ্যখানে বাঁধ দিয়ে সড়ক সংকুচিত করে ঘর বাড়ী করার জন্য ভিটে তৈরী করছে অনেকে।

ছরার উপর বাঁধের কারণে পানির প্রবাহ থেমে যাবে। ফলে যথাসময়ে পানির চলমান গতিপথে বাধার কারণে আশপাশের এলাকাসহ ফসলিজমি ও ঘরবাড়ী ডুবে যাওয়ার শংকা বাড়ছে দিনে দিনে।

এছাড়া ইরি ধানের আবাদের জন্য পানির একমাত্র ভরসা খালগুলো। কিন্তু খালে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় অনেক কৃষক ইরি ধান আবাদ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। মিরসরাইয়ের ১ নং করেরহাট থেকে ১৬ নং সাহেরখালী পর্যন্ত পুরো এলাকাজুড়ে অসংখ্য খাল ও ছরা রয়েছে।

যার অধিকাংশ মৃত প্রায়। উপজেলার অন্যতম একটি শান্তিরহাট হয়ে বয়ে যাওয়া খালটির এক সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। যেখানে ব্যবসয়ীরা প্রতিদিন নিত্য নতুন পণ্য নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা করে পন্য সামগ্রী এনে স্থানীয় শান্তিরহাট বাজারে বিকিকিনি করতো।

অনেকের পূর্বপুরুষরা শান্তিরহাট হয়ে নদী পথের সওদার বলে আজো সুখ্যাতি। কিন্তু গত কয়েক যুগের বেশি সময় ধরে এমন চিত্র আর চোখে পড়েনা। এখানে কোন ইঞ্জিন চালিত ট্রলার আসেনা।

কারণ একেতো ব্যবসা মন্দা এবং খাল সংকুচিত হওয়ার ফলে ট্রলার চলাচলের উপযুক্ত যায়গা নেই। খাল পাড়ের দৃশ্যে বাজারের অংশে কয়েকটি স্থানে দখলের চিত্র দেখা যায়।

এছাড়াও স্থানীয় বাজারে ব্যবসায়ী ও বাসন্দিাদের দৈনন্দিন আবর্জনাগুলো খালেই ফেলা হচ্ছে। ফলে পানির গতিপথ রোধ হচ্ছে এবং মারাত্মক পরিবেশ দূষন হচ্ছে। জোরারগঞ্জ থেকে ইছামতি হয়ে বয়ে যাওয়া খালটির করুন দশা।

বিশেষ করে খাল পাড়ের জমিতে সম্প্রতি মানুষ তাদের বসতি করার ফলে খালের পাড়ের একাংশ নিয়ে তারা দেয়াল নির্মাণ করছেন ইচ্ছে মতো। এর ফলে খাল খননের সময় খাল পাড়ে মাটি রাখার কিংবা খাল সম্প্রসারনের কোন ব্যবস্থা থাকবেনা।

এছাড়াও স্থানীয়দের ময়লা আবর্জনা ফেলে খাল ভরাট ও পরিবেশ দূষন করলেও স্থানীয় প্রশাসনের কোন নজরদারিতা নেই।

বিষুমিয়ার হাট থেকে নাহেরপুর এর দিকে বয়ে যাওয়া ছোট ছরাটি একবারে মৃত বল্লেই চলে। অথচ সেই ছরায় প্রতি বর্ষায় মানুষ জাল দিয়ে মাছ ধরতো। ছরার উপরে ছিল কয়েকটি বাশের সাঁকো।

এখন ওই ছরার অবস্থান একবারে বিলীন হতে চলেছে। স্থানীয়দের বসতির ফলে ছরার পাশ দখল, ছরার উপর দোকান নির্মাণ এবং দীর্ঘ বছর জুড়ে খনন না করার ফলে এই ছরার আজ এই ক্সদন্যদশা।

করেরহাট এলাকায় বারইয়ারহাট করেরহাট সড়কে বেইলি ব্রীজ নির্মাণের ফলে খালের উপর বাঁধ দেয়ায় এবং খালের সামান্য অংশ খোলা রাখায় আসন্ন ববর্ষায় পাহাড়ী ঢলের চাপে পানি সরবরাহ না হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।

ফলে ওই এলাকায় অধিকাংশ জমি, ঘরবাড়ী ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। করেরহাট বাজারে সামান্য বৃষ্টি এলেই হাটুপানি। গত বছর বাজারের বিশাল অংশে বছর জুড়ে দুর্ভোগ পোহায় সকলে।

জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তার পিচ আর কার্পেটিং উঠে হয়ে যাচ্ছে গর্ত। অথচ প্রাকৃতিক এই ছরার অবশিষ্টাংশ এখনো দখল চলছে। সর্বোপরী পুরো উপজেলাজুড়ে অবস্থিত অধিকাংশ খাল ও ছরা দখল আর দূষণের ফলে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

আবুতোরাব, বামনসুন্দরে ও একই অবস্থা। খৈয়াছরা, গোভানিয়া, হিঙ্গুলী খালেরও একই দশা। একদিকে খনন না করার ফলে অধিকাংশ খাল সংকুচিত হচ্ছে। অপর দিকে ময়লা আবর্জনার ভাগাড়।

তার উপর দখলদারদের আগ্রাসন। এ থেকে উত্তোরনের ব্যবস্থা না করলে প্রতি বছর ঘুরে বর্ষা এলেই পাহাড়ী ঢলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতিবৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা হয়েছে।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে খাল খননের বিষয়ে কথা বলবো। খালের পাড় দখল এবং ময়লা ফেলে পরিবেশ দূষনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *