স্বপ্ন ও রঙিন আলোতে ভরপুর সজল ক্যাম্পাস…শাহনাজ শিমু

হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণে মুখরিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিবছরই শত শত বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে আসে ছাত্রছাত্রীরা।শাটল ট্রেনের ব্যস্ত ঝিকঝিক শব্দ এবং শিক্ষার্থীদের হৈ চৈ কোলাহলে উল্লাসিত হয়ে ওঠে স্টেশন চত্বর। নানা রকম বেসুরা গলায় গান ও হৈ হুল্লর লেগেই থাকে শাটলের বগিগুলোতে। বিভিন্ন ধরনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য আকর্ষনীয় করে তুলেছে ক্যাম্পাসকে।

পাহাড়ের ‍বুকে চিরে চলে যাওয়া কাটা পাহাড়ের রাস্তাটা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে সবাইকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট থেকে তাকালে যেনো মনে হয় সামনেই শহীদ মিনার দেখা যায়। কিন্তু হাঁটতে লাগলে ১৫-২০ মিনিট লেগে যায় শহীদ মিনারে পৌছাতে। কাঁটা পাহাড়ের দুপাশে পাহাড়ি গাছে সবুজ শ্যামলে ভরে উঠেছে। চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। অবারিত সবুজ যেন অপেক্ষা করছে আগন্ত্তককে স্বাগত জানাতে। দেখে এতই ভালো লাগে সকলের এবং অনেকে বলে ওঠে,” বাংলার মুখ যেন দেখিয়াছি”।এমন সুন্দর রাস্তাটি দেখে মনোমুগ্ধকর না হয়ে পারে না প্রত্যেকটি মানুষ । রাস্তাটি শেষ হলেই শহীদ মিনার। প্রতিনিয়ত নানা মানুষ দেখতে আসে শহীদ মিনার।শহীদ মিনারের আশেপাশে ফুটে থাকে কৃষ্ণচূড়া এবং নাম না জানা নানা রকমের ফুল। দেখে যেন মনে হয় রঙিন আলোতে কানায় কানায় ভরে উঠেছে সজল ক্যাম্পাস। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের পাশেই আছে ঝুলন্ত ব্রিজ।হঠাৎ করে দেখলেই মনে হবে এ যেন রাঙামাটির সেই ঝুলন্ত ব্রিজই। ঝুলন্ত ব্রিজের আকর্ষনে ছুটে আসছে পর্যটক।অনেকে আবার স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার জন্য এর উপর উঠে তুলছে ছবি অথব সেল্ফি। একনজরে মন কেড়ে নেয় এই ঝুলন্ত ব্রিজটি। ক্যাম্পাসের ঝুপড়িগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় জমজমাট আড্ডা তারুণ্যের উচ্ছ্বাস আর বেসুরো গলার গান।এছাড়াও কেউ কেউ আবার গ্রুপ স্টাডি নিয়ে ব্যাস্ত। প্রেমিক জুটিরা বসেও গল্প করে আর তাকিয়ে থাকে একে অপরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে।

পাহাড় ও পর্বতে ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আছে একটি প্রাকৃতিক ঝরণা।যা দেখতে ছুটে আসে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ।আর এটি আকৃষ্ট করছে সুন্দর পিপাসু মানুষকে।কলাভবনের পাশেই এটি অবস্থিত। মাত্র ৫ মিনিটের পথ কলাভবন থেকে।দূর থেকেই ঝরণার কল্ কল্ শব্দ শোনা যায়।আর কাছে গেলেই দেখা যায় পাহাড়ের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।এই অশ্রুর শেষ নেই।অনেকে আবার এ সৌন্দর্য উপলব্ধি করার জন্য নেমে যায় পানিতে।কেউ কেউ আবার গুণ গুণ করে গাইতে থাকে,” আপনাকে আজ ঝরণা ধারায় ধুইয়ে দাও ধুইয়ে দাও”।চারিদিকে তাকালে শুধু দেখা যায় সবজি বাগান আর গাছের সারি।

বুদ্ধিজীবী চত্বর, সুনামি গার্ডেন, জারুলতলায় বসে গল্প করে গল্পবাজরা। এ ছাড়াও বন্ধু বান্ধবের আড্ডায় মেতে ওঠে এ জায়গাগুলো।

বোটানিকাল পুকুর পাড়ে গেলে দেখা যায় বন্ধু বান্ধবের চড়ুইভাতি,কারো জন্মদিন পালন এছাড়াও দেখা যায় কয়েকটি জুটিকে।তাদের কথা কিছুতেই ফুরায় না। সাঁতার শিখা অথবা সাঁতার কাটতে অনেকে আবার নামে গোলপুকুরে। গোলপুকুরটি দেখতে অনেক সুন্দর।তাই এর নাম গোলপুকুর। কিন্তু কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার কারনে গোল পুকুরে নামা নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষরা। ফরেষ্ট্রিতে রয়েছে নানা রকম গাছপালা। চারপাশে নানা রকম গাছের সারি দেখতে পাওয়া যায়, যেতে যেতে দেখা যায় অসংখ্য জুটি বসে গল্প করছে।এছাড়াও বিশাল খেলার মাঠে প্রতিনিয়ত খেলা করছে অসংখ্য শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব খেলা হয়ে থাকে এ মাঠটিতে। বিশাল মাঠটি দেখে মনটি জুড়িয়ে যায়।

মাঠের কিছু দূরেই অবস্থিত একটি সুইচ গেইট।অসংখ্য মানুষ ভিড় জমায় এটি দেখতে। উপরে একটি ব্রিজ এবং নিচেই পানি। আবিরাম স্রোতে যেতেই থাকে পানিগুলো। শুক্রবারে প্রচুর মানুষ দেখা যায় সুইচ গেইটে। বন্ধের দিন তাই কেউ কেউ তার পরিবারের সাথে চলে আসে উপভোগ করতে এ সৌন্দর্য্য। ব্রিজের উপর থেকেই অনেকেই সৌন্দর্য্য উপলব্ধি করে। কিন্তু কেউ কেউ আবার লোভ সামলাতে না পেরে নেমে যায় পানিতে। যখন সন্ধ্যা নামে তখন অনেকে কবির ভাষায় বলে, “দিনের আলোক রেখা মিলিয়ে দূরে, নেমে আসে সন্ধ্যা ধরণীর পুরে”। তাইতো ঘরে ফিরে যেতে হয় সকলকে। সুইচ গেইটের পাশেই আছে প্যাগোডা। বৌদ্ধদের মন্দির এটি। এখানে ছাত্রদের থাকার জন্য ব্যবস্হা আছে। প্যাগোডার ভিতরে রয়েছে একটি পদ্ম পুকুর। পদ্ম পুকুরে পদ্ম ফুল ফুটে থাকতে দেখা যায়। পর্যটকরা এসে এসব সৌন্দর্য উপলব্ধি করে।

লাইব্রেরি চত্বরের দিকে তাকালে দেখা যায় অসংখ্য ফুল ঝড়ে পড়ে আছে এছাড়াও লাইব্রেরির সামনে সবসময় বসে থাকতে দেখা যায় বন্ধু বান্ধদের গ্রুপ স্টাডি এবং গল্পবাজদের। লাইব্রেরির কাছেই রয়েছে জাদুঘর। এখানে রয়েছে নানা শিক্ষানীয় জিনিস।এমনকি টারশিয়ারী যুগের মাছের জীবাশ্ম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরেই সংরক্ষিত রয়েছে।এসব দেখার জন্য ছুটে আসছে অনেক মানুষই। সকালের ব্যস্ততা শেষে বিকেলে ক্যাম্পাসটিকে যেন আরো বেশি সুন্দর দেখায়। ছোট বড় নানা বয়সের মানুষকে দেখা যায় বিকালে হাঁটতে বেরিয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় বসে গল্প করতে দেখা যায় বন্ধু বান্ধবদের। বিকেলে ক্লান্ত রোদে হতাশার মোড় দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ব্যর্থ প্রেমিকদের। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর করে সৌন্দর্য পিপাসু মানুষকে। এটি পৃথিবীর অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে একটি। বিভিন্ন মানুষ উপলব্ধি করতে আসে এসব সৌন্দর্য্যকে। নানা রকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এ সজল ক্যাম্পাস।

লেখক: শাহনাজ শিমু
২০১৬-১৭ সেশন
বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *