পুলিশ জহিরের মহানুভবতায় নতুন ঘর পেল পপি

জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া দশ বছরের বেশি সময় ধরে কর্মরত আছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে। নিষ্ঠা আর সততার সাথে দায়িত্ব পালন করায় হাসপাতালের সবাই এক নামে চেনেন তাকে।

দায়িত্ব পালনের প্রথম দিকে হাসপাতালের ডান পাশে পুলিশ ফাঁড়িটি ছিল একটি ছাপড়া ঘর। সেখানে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন এক মহিলা স্বামী নিয়ে বসবাস করতেন। তাদের সংসারে ছিল এক কন্যা সন্তান পপি। এক সময় ছাপড়া ঘর থেকে আধুনিক সুযোগ সুবিধা যুক্ত হয় পুলিশ ফাঁড়িতে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে পরিবারটি।

ছোট একটি তাবু ঘরে স্থান হয় তাদের। পপিকে দেখে মায়া জাগে জহিরুলের। তখন থেকে সাধ্যমত পরিবারের দেখভাল আর কন্যা সন্তানের দায়িত্ব নেন। মাদরাসায় ভর্তি করান পপিকে। নিজের মেয়ের মতো তার আবদার পূরণ করতেন।

সময়ের পরিক্রমায় ছোট সেই কন্যা সন্তান পপি আজ ১৯ বছরের পদার্পণ করছে। বাবা বাবুল মিয়া পান সিগারেট বিক্রেতা । পরিবার চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। পপির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন জহিরুল। পরিকল্পনা করেন তাকে ‍নিজের হাতেই বিয়ে দিবেন। যেই কথা, সেই কাজ। নেমে পড়েন পপির জন্য ছেলে দেখার কাজে। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় জসিম নামে এক পাত্রের সন্ধান পান, যে পেশায় কৃষক। এরপর উভয়ের মধ্যে দেখাশোনার পর একজন আরেকজনকে পছন্দ হয়।

মঙ্গলবার (৩০এপ্রিল) দুপুরে হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়িতে পপির আর জসিমের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়। পুলিশ ফাঁড়ির আঙিনায় সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে বিয়ের প্যান্ডেল তৈরি করা হয়। আর ভেতরে চলে বিয়ের অনুষ্ঠানিকতা। হাসপাতাল আঙিনায় বিয়ের প্রস্তুতি দেখে সেবা নিতে আসা আর গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড় শুরু হয়। উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়ে হাসপাতালে। দুপুরে দুইটায় বর পক্ষের লাল ফিতা কাটার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় বিয়ের আনুষ্ঠিকতা। বিয়েতে পপির পরনে ছিল বিয়ের বেনাসরি শাড়ি আর সাজগোছ।

এরপর দুই লাখ টাকার কাবিন আর ৫০ হাজার টাকার উসুলে  বিয়ে পড়ান কাজী জাহেদুল ইসলাম। বিয়ের অতিথি আর আত্মীয়-স্বজনের জন্য ব্যবস্থা করা হয় জম্পেশ আপ্যায়নের।

সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে জহিরুলে ভূয়সী প্রশংসা জানিয়ে বিয়েতে এসেছিলেন চট্টগ্রামের উপ পুলিশ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক, অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মিজানুর রহমান, সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার দেবদূত মজুমদার, পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কাশেম ভূঁইয়া, চকবাজার ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু প্রমুখ।

এসময় উপ পুলিশ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক সাংবাদিকেদের বলেন, পুলিশও মানুষ। জনগণের নেতিবাচক ধারণার মাঝে জহিরুলের এমন উদ্যোগ গোটা বাহিনীর সম্মানকে সমুন্নত করবে। আমরাও যে পারি, সে দরজাকে উন্মুক্ত করার একটি প্রয়াস এটি। হতদরিদ্র পরিবারটির প্রতি আমাদের সহায়তা সবসময় থাকবে। সামনেও তার প্রতি যে কোনো ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

মেয়ের বিয়ে দেখে কান্না ধরে রাখতে পারেননি বাবা বাবুল মিয়া। তিনি সিভয়েসকে জানান, বিয়ে কিভাবে হচ্ছে, তার কোনো খরচই আমার দেইনি। জহির ভাই, মেয়ের চাচা, বাবা সব। সবকিছু তিনি আয়োজন করেছেন। আমারে শুধু বলছেন মেয়ের জন্য দোয়া করে যেতে। আমরা সারাজীবন তার কাছে ঋণী।

বিয়ের আনুষ্ঠিকতার সময় মালাবদল নিয়ে পপি আর জসিম খুঁনসুটিতে মেতে ছিলেন। তাদের চোখে মুখে তৃপ্তির মাঝে স্বপ্ন আর নতুন পথচলা। যা দেখে আবেগাপ্লুত করে জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়াকে।

তিনি অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কিছুক্ষণ থেমে যান। পরেক্ষণে বলেন, আমি একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে  একটি মেয়েকে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে তুলে দিয়েছি। কোরআন, বাইবেল যাই বলেন, আমি মনে করি মানুষ হিসেবে একজন মানুষের পাশে এগিয়ে আসতে হবে। আজ আমি অনেক খুশী। একইসাথে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই এমন একটি কাজে যারা আমাকে পরামর্শ এবং অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন।

এদিকে, পপির বিয়ের খবর পেয়ে পোর্টল্যান্ড গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিজানুর রহমান মজুমদার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে একটি সেলাই মেশিন দেন। সে সঙ্গে বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিনিধি নগদ টাকা দিয়ে সহায়তা করে দাম্পত্য জীবনের জন্য দোয়া চান।

news by সিভয়েস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *